হাওয়াই আদর

একটা মিটিং ছিল ব্রহ্মপুত্রের তীরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কে। একটা নতুন প্লাটফর্ম তৈরি নিয়ে মিটিং, যেখানে সবাই যুক্ত থাকতে পারবে, যেখানে খবর পাওয়া যাবে দেশ বিদেশের কিন্তু খবরের চাপ নিতে হবে না।

যাইহোক ভালোয় ভালোয় শেষ হল সব। যার যার মত চলে গেল সবাই, আমি রয়ে গেলাম নদীর ধারে একটু হাঁটব বলে। যদিও বার বার নদী বলছি কিন্তু আসলে এটা নদ। আমার অবশ্য নদ শব্দটা একেবারেই পছন্দ না। নদীর মিষ্টি পানি, কুল কুল করে বয়ে চলা স্রোত, স্রোতের সেই শব্দ, নদীর ধারের কোমল বাতাসের পরশ এই সব ব্যপারগুলতেই একটা নারী সুলভ কোমলতা আমি অনুভব করি। কাটখোট্টা পুরুষালী কোন ব্যপারের সাথে আমি এসবের কোন মিল খুঁজে পাই না। তাই ব্রহ্মপুত্র আমার কাছে ব্রহ্মপুত্রী, নদ নয় নদী।

এই নদীটা আমার কত কথা যানে। কত পুরনো, কত আপন। তাই একটুক্ষণ সময় কটাতে চাইলাম দুজনে।

পাড় ঘেঁষে একটু দাড়াতেই অনুভব করলাম সেই পুরনো আদুরে হাওয়ার স্পর্শ। খুব কাছের কেউ পেছন থেকে আলতো করে ঘাড়ের কাছে মুখটি এনে জড়িয়ে ধরলে হয়ত এমন একটা আদুরে অনুভূতি হতে পারে।

হঠাৎ হাওয়াই মিঠাইয়ের মতন মিলিয়ে গেল নদীর হাওয়াই আদর! ভাবলাম এবার হয়ত প্রতিদান দেওয়ার পালা। একটু পরেই আবার হাওয়া বইতে শুরু করল। আমারও ফেরার সময় হয়ে গেল। ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

ফিরতি পথে নদীর হাওয়াই আদর পেছন থেকে আলতো করে ঘাড়ের কাছে মুখটি এনে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলে দিল – ‘আদরের কোন প্রতিদান হয়না বোকা’।

মানব ইতিহাসে ছাগলের অবদান!

ছাগল। মাংস, দুধ, চামড়া, বাচ্চা-কাচ্চা সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে উপকার করছে আমাদের। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মানব ইতিহাসে এক বিশাল অবদান রেখেছে এই ছাগল!

৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ। কালদি নামের ইথিওপিয়ার এক ছাগল পালক, প্রতিদিনের মতো সেদিনও গিয়েছেন ছাগল চরাতে। ছাগলগুলোকে চরতে দিয়ে সে চলে গেছে আরাম করতে। দুপুরের দিকে ঘুমিয়েও পরেছিল একটু। বিকেলে জেগে উঠে আবার বাঁশিতে ফুঁ। এবারে সেই সুর, যা সে প্রতিদিনই বাজায় ছাগলের পালকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে আনার জন্য। এই সুর শুনেই ছাগলগুলো তার কাছে ফিরে আসে এবং বাড়ির পথ ধরে। কিন্তু সেদিন ছাগলগুলো এলোনা। চিন্তিত হয়ে পড়ল কালদি। খুঁজতে শুরু করল।

একটুক্ষণ খুঁজেই পেয়েগেল ছাগলগুলো। কিন্তু সমস্যা হল, ব্যপক লাফালাফি শুরু করেছে ছাগলগুলো। দেখে বুঝারও উপায় নেই যে দিনভর এগুলো পুরো ভূমিতে চরেবেড়িয়েছে। আজ এদের যেন কোন ক্লান্তিই নেই! ব্যপারটা বুঝার চেষ্টা করল কালদি। খেয়াল করল, ছাগলগুলো ইথিওপিয়ার ঝোপ থেকে এক ধরণের ছোট ছোট লাল ফল খাচ্ছে আর তুমুল উৎসাহে লাফালাফি করে যাচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে উঠলো কালদি। দু’তিনটা ফল হাতে তুলে নিল, ঘুড়িয়েফিরিয়ে দেখল। মুখে পুরে দিল। খেয়ে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যপক চাঙ্গা হয়ে উঠলো কালদির শরীর। সে বুঝতে পারলো এটাই তাহলে ছাগলদের উৎসাহী হয়ে উঠার উৎস।

কিছু ফল সংগ্রহ করে ছাগলগুলো নিয়ে কালদি চলে এলো গ্রামে। গ্রামের লোকেদের ঘটনাটা বলল। তারপর সবাই মিলে ফলগুলোকে ফুটিয়ে পানিয় তৈরি করে পান করল। এবারে কাঁচা ফল খাওয়ার থেকেও বেশি উৎফুল্লতা অনুভব হল। ব্যস, শুরু হয়ে গেল কফি খাওয়া।

হ্যাঁ, এতক্ষণ কফি আবিষ্কারের ইতিহাসই বলছিলাম। আর সেই লাল ফলটা হচ্ছে কফি ফল। এই ইতিহাস এখনো ঘুরে বেড়ায় ইথিওপিয়ার মানুষের মুখে মুখে।

ভাবুন একবার, এক পাল ছাগল কিনা আবিষ্কার করে বসল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বিক্রিত পণ্য যা বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বেশি পানকৃত পানীয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রায় ৭০টি দেশে এই ফলের গাছ জন্মে। ২০১০ সালে ৭ মিলিয়ন টন কফি উৎপাদিত হয়েছে সারা পৃথিবীতে। আর হ্যাঁ ভারত, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ায় কিন্তু আজও ছাগলরা কফি ফল খায়!

সৃতিতে বাজার রোড

প্রথম যেদিন বাবার সাথে ঘাটাইলের বাজার রোডে গিয়েছিলাম আমি সেদিনটার কথা আজও মনে করতে পারি। হাটবার ছিল সেটা। কত ভিড়! কত মানুষ! আমি বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে ছিলাম। আগে কোন দিন মফস্বল দেখিনি তাই অবাক হয়ে দেখছিলাম চারিদিক। রাস্তার পাশ ঘেঁষে অনেকটা ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে দোকানের পসরাগুলো। ‘আগামীর আয়োজন’ সজিয়ে বসেছিল দোকানিরা। আমি দেখছিলাম আর বাবার সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে বারবার বেসামাল হয়ে যাচ্ছিলাম।

একটা রাস্তা, কিছু দোকানপাট আর এক দলা ভিড় যে কারো কষ্টের সাক্ষী হয়ে উঠতে পারে তা আমি জানতাম না। জেনেছিলাম এই বাজার রোডে এসে। আমার কিছু বিস্বাদ সৃতি সে চুপচাপ আগলে রেখেছে নিজের মাঝে, কাউকে বলেনি। তাইতো যতবার ছেড়ে আসি বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। বাজার রোডটা দেখতে দেখতে বাসে উঠি। যদি বাস আরও কয়েকটা সেকেন্ড দাঁড়ায় আমি তাকিয়ে থাকি প্রিয় বাজার রোডটার দিকে।

জানিনা আর কোন দিন যাওয়া হবে কি না। যাওয়া হোক আর নাই হোক আমি এই রাস্তাটাকে ততখানিই ভালোবেসে যাব, যতখানি বেসেছিলাম প্রথম দিন; যেদিন আমার হৃদয় ছিল নিষ্পাপ, কোমল আর বিশ্বাস করতো এই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাব আমার বাড়িতে – গর্জনায়।

বলবো না

তখন সবে হাই স্কুলে পা দিয়েছি। শীতের মধ্যে সকাল সকাল লেপের নিচ থেকে উঠতে কি যে কষ্ট হতো। হাতমুখ ধোয়ার জন্যে পুকুরের সামনে দাঁড়াতেই মনে হতো ঝেড়ে একটা দৌড় দিয়ে আবার লেপের মধ্যে গিয়ে ঢুকি। অবশ্য মায়ের রুদ্রমূর্তিটা মনে পড়ত বলে তেমনটা করা হতো না কখনোই।
গরম ভাতের সাথে কোন দিন বর্তা, কোন দিন ভাঁজি অথবা ডাল এই দিয়ে খেয়েদেয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়তাম স্কুলের জন্যে। ঈদগার কাছাকাছি এসে সবার সাথেই দেখা হতো। তারপর পাখির মত দল বেঁধে আনন্দগুলো ভাগাভাগি করে কাটিয়ে দিতাম সারাটা দিন। এটাই যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছিল আমাদের। কিন্তু নিয়ম তো ভাঙার জন্যেই।

একদিন সকালের কথা। ঘুম ভাংতেই দেখি মা বাবার মাথার কাছে কপালে হাত দিয়ে বসে কাঁদছে। বাবা শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে কোকীয়ে উঠছে, ব্যথায়। তখন হাঁটুগুলো অনেকটা ভাজ করে উপরে নিয়ে আসছে, কুচকে ফেলছে চোখ, দু’হাত দিয়ে খামছে ধরছে পেট। আমি বুঝতে পারলাম ব্যথাটা পেটে।
ধীরে ধীরে বাবা কিছুটা শান্ত হয়ে এলো। মা উঠে গেল পাশের ঘরে। আমি পাশেই বসে ছিলাম। হঠাৎ বাবা বালিশ থেকে মাথাটা একটু তুলে বলল – ‘গায়ে কোথাও পচন ধরলে কেমন লাগে জানিস?’ আমি এমন প্রশ্ন কোনদিন শুনিনি। জিজ্ঞেস করলাম – ‘কেমন লাগে বাবা?’ বাবা ছলছল করা চোখ নিয়েও মুচকি হেসে বলল – ‘বলবো না’।

তার কিছুদিন পর, আমি তখন আর স্কুলে যাই না সারাদিন বাবার পাশেই বসে থাকি। বাবা সারাদিন শুয়ে থাকে, কখনো গলা দিয়ে গড়গড় শব্দ করে নিজেই জেগে উঠে কাশতে শুরু করে, মা পাশ থেকে গরম পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয়। আমি পাশে বসে থাকি। বাবাকে চামচ দিয়ে জাও খাইয়ে দেওয়া হয়, আমি পাশে বসে থাকি। নিয়মিত মানুষের আনাগোনা হয় বাড়িতে, আমি পাশে বসে থাকি। কখনো কখনো বাবা পেটটা খামছে ধরে চিৎকার করে ওঠে ব্যথায়, মা বাবাকে জাপতে ধরে মাথাটা বুকের কাছে নিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে, আমি কেঁদে উঠি।

একদিন বাড়িটা খুব বেশি নিরব হয়ে গেল। মা একটু পর পর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে, সাথে কিছু নিকটাত্মীয়রাও। কেউ কেউ দোয়া পড়ছে। এত মানুষ তবুও বেশি আওয়াজ নেই বাড়িটায়। বাবা আজ চিৎকার করছে না, শুধু একটানা গুঙিয়ে চলেছে। গড়গড় আওয়াজ হচ্ছে গলা থেকে। একটু পর পর মুখের ভেতরটা রক্তে ভোরে উঠছে, যখন উপচে পড়ছে গাল বেয়ে তখন মুছিয়ে দিচ্ছে কেউ। আমি পাশে বসে আছি।
সেদিন সন্ধ্যায় যখন গ্রামটা নিয়মমাফিক নীরব হয়ে গেল, বাবার প্রিয় পূর্ণিমার চাঁদটা যখন তার সবটুকু আলো ঢেলে দিচ্ছিল আমাদের গ্রামে তখন কি হয়েছিল জানো?
বলবো না।

নীড়হারা

“ঘুম পাচ্ছে বাবা? এক্ষুনি বাসায় চলে যাব…” বলতে বলতে ছেলেকে কোলে নিয়ে শহীদ মিনারের গেইট থেকে বেরিয়ে গেল লোকটি। সেদিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থানটা যেন আরেকবার বুঝতে পারলো মহিলাটি। মহিলা বলাটা ঠিক মানানসই হচ্ছে না আবার তাকে মেয়েও বলা যাচ্ছে না। সে আগে থেকেই জানতো, এখানে আজ জায়গা হবে না। তবুও এসেছিল।

শহীদ মিনার চত্বরের কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছাকাছি যে বেঞ্চটা আছে তাতে সে ঘুমায়, সাথে থাকে তার হামাগুড়ি দেওয়া ছেলেটা। বহুদিন হলো তারা এখানে ঘুমায়। বিশেষ বিশেষ দিনে যখন সবাই ছুটি পায় তখন তাদেরও ছুটি দেওয়া হয় সিমেন্টের তৈরি শক্ত বিছানাটিকে। কিন্তু ঘুম কি ছুটি নেয় কখনো? তাই তো ফিরে আসা।

ছেলেটা বারবার ঘুমে ঢলে পড়ছে। অযথাই আর সময় নষ্ট করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো সে। আজ রাতটা কাটানোর জন্য কোন একটা নিরিবিলি ফুটপাথ খুঁজে নিতে হবে।

%d bloggers like this: