Category Archives: চিন্তাভাবনা

ছুটিবিহীন জীবন

এক ভদ্রলোক তার স্ট্যাটাসে লিখেছে, অনেকদিন ছুটি নেয় না, প্রায় দু’বছর। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় না, আত্মীয়দের বাসায় যায় না। শুধু অফিস টু বাসা, বাসা টু অফিস। আর এটা নাকি তার স্ত্রীর উৎসাহেই হয়েছে। লেখাটা পরে মনে হল না তিনি এই ব্যপারটায় অখুশি। তবে এখানে আমার একটা দ্বিমত আছে।

তোরাহ’তে আছে মসী (মুসা আঃ) যখন দেখলেন যে হিব্রু দাশ জাতির জীবনে ছুটি বলতে কিছু নেই তখন তিনি শনিবার কে হিব্রুদের ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেন। দিনটিকে হিব্রুতে সাব্বাত বলা হয়। সহজ করে বলা যায় ‘মসীর দিন’। এটিকেই বলা চলে অফিসিয়ালি ছুটির প্রথম ঘোষণা। যাইহোক, মসী বুঝতে পেরেছিলেন যে সপ্তাহে এক দিন ছুটি না পেলে জীবনের সাভাবিক ছন্দ বা গতি কোনটাই থাকে না।

একই কারনে আমিও ছুটি না নেওয়াটাকে অপছন্দ করি। অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠান মালিকের কাছে ছুটি না নেওয়াটা একটা আইকনিক ব্যপার রীতিমত। সম্ভবত এক-দু’বছর আগে এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক পুরষ্কার পান এই কারনে যে তিনি তার সার্ভিস লাইফে একদিনও ছুটি নেননি। আমার হিসেবে লোকটিকে পুরষ্কার না দিয়ে তিরস্কার করা উচিৎ ছিল। কারন তিনি রীতিমত অসামাজিক একজন লোক। ‘ছুটি নেননি’ এই ব্যপারটা থেকে এটা পরিষ্কার যে তিনি নানান ধরণের দাওয়াত এমনকি শেষকৃত্তের অনুষ্ঠানেও ঠিকমত যোগ দেননি। কারন কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলে, পুরো অনুষ্ঠানে ঠিকমত অংশ নিয়ে শেষ করলে এক দিন তো নিশ্চিত ভাবেই লাগবে। কিন্তু তিনি তা নেননি। তাই তাকে সহজ ভাষায় অসামাজিক বলাই যায়।

সেই শিক্ষক লোকটির উদাহরণ দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। উনার এহেন অসামাজিকতা ভালো লাগার কারন আছে বৈকি!

আলুনামা

আপনি যদি আলু ভক্ত হয়ে থাকেন তাহলে একটা ধন্যবাদ দিন ইনকাদের। কারণ ওরাই পৃথিবীর প্রথম আলু উৎপাদনকারী জাতি। আরেকটু গোঁড়া থেকে বলি, ধারণা করা হয় ১১০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ইনকারা বেরিং প্রণালী পার হয়ে এশিয়া থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্দিজ পর্বতমালার পেরুর উচ্চভূমির দিকে চলে আসে এবং সেখানে “আলু” সহ আরও অন্যান্য কৃষিজ পন্য উৎপাদন করে, লামা পুষে বসবাস শুরু করে।

ইনকারা ছিল আলুর একনিষ্ঠ ভক্ত। ওদের ঝোলে-ঝালে-অম্বলে সবকিছুতেই আলু। হজমের সুবিধার জন্য সব খাবারেই আলু, হাড় ভাংলে আলুর রস, বাতের ওষুধ হিসেবে আলু, সময় পর্যন্ত মাপত আলুর ফলন দেখে (দেখ কাণ্ড!)।

গোড়াপত্তনের তিনশ বছর পরে স্প্যানিশরা লুটপাট শুরু করে ইনকাদের। মানে স্প্যানিশরা পৃথিবীর দ্বিতীয় জাতি যারা আলু চোখে দেখে, স্বাদ নেয় আর চাষবাস করে। ওদের হাত ধরেই আলু পৌঁছে সাড়া ইউরোপে। প্রথম দিকে ভাবা হতো আলু শারীরিক উত্তেজনা বাড়ায়, যদিও পরবর্তীতে আলু তার নিজ গুণেই লোকেদের ভুল ভাঙায়। শুধু যে ভুল ভাঙিয়েই খান্ত হয়েছে তা নয় স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর খাদ্য তালিকাতেও যায়গা করে নিয়েছিল অনায়াসে, স্প্যানিশ সেনাবাহিনী তখন পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে আছে; ব্যস আর কি, আলু সেনাদের ঘাড়ে চেপে ছড়িয়ে গেল পুরো ইউরোপে।

জার্মানির রাজা ফ্রেডরিখ উইলিয়াম আলু খেয়ে এমনই ভক্ত হোল আলুর যে সকল প্রজাদের আদেশ দিল আলু চাষ করে খেতে, না করলে নাক কাটা যাবে! ব্যস জার্মান দখলও শেষ।

প্রথম বার আলু দেখে রানি প্রথম এলিজাবেথের বাবুর্চি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে আলুর গাছটা রেখে আলুকে আবর্জনা মনে করে ফেলে দিয়েছিল!

উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে – “পৃথিবীর খাদ্য হিসেবে সর্বপ্রথম আলুর নির্দশন ভারতের বাংলায় দেখা যায়। পালযুগের কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর (আনুমানিক ১০৮৪-১১৫৫) রামচরিতে বারাহী কন্দের উল্লেখ আছে। এই বারাহী কন্দ হল উচ্চমানের আলু, রতিকান্ত্র ত্রিপাঠী জানাচ্ছেন “প্রাচীন বাংলার শিলা ও তাম্রলিপিতে সমাজ ও সংস্কৃতি” বইটিতে।” এই তথ্য ঠিক থাকলে বলা যায় বাংলার মানুষজন ইনকাদের কাছাকাছি সময়ে অথবা আগেই আলুর চাষবাস শুরু করে। যদিও এডওয়ার্ড টেরি লিখেছেন – “ব্রিটিশ রাজদূত স্যর টমাস রো’র সম্মানে ১৬৭৫ সালে আসফ খান আজমেঢ়ে যে ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন, তাতে আলু পরিবেশিত হয়েছিল।”

এটি পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য, জাতিসংঘ এফএও-এর রিপোর্ট অনুযায়ী একজন মানুষ প্রতিবছর প্রায় ৩৩ কেজি আলু খায় (আমার বেশি লাগে)।

“জাবতক রহেগা সমোছেমে আলু, ম্যা তেরা রাহুঙ্গা ও মেরে শালু” এই গানটা ছাড়া আলু নিয়ে কি আরও কোন গান আছে?

টিভি সিরিয়াল

কলকাতার সিরিয়াল নিয়ে অনেক লেখালেখি দেখেছি ফেসবুকে, এখনো মাঝে মাঝে চোখে পরে, পত্রপত্রিকায় দেখেছি বহুবার, অনেককে এবিষয়ে কথা বলতে শুনেছি। সবাই মোটামুটি একমত – এসব বন্ধ করা উচিৎ; কারণ এগুলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বেশ, বন্ধ করা যেতেই পারে। কিন্তু এগুলোর পরিবর্তে আমরা এদেশের বিশাল সংখ্যক টিভি সিরিয়ালের দর্শককে কি দেবো?

কলকাতার সিরিয়ালের দর্শক মূলত এদেশের মেয়ে এবং মহিলারা। পুরুষের তুলনায় তাদের পৃথিবী ছোট। একজন পুরুষের সুযোগ আছে যে কোন সময় বাইরে থেকে ঘুরে আসার, আড্ডা দিয়ে আসার অথবা বনোদিত হওয়ার কিন্তু নারীর তা নেই। নারীদের জন্যে আমাদের সমাজে অনেক নিয়ম-কানুন। তাই বলে কি তাদের বিনোদন থেকে বঞ্চিত করে রাখা যাবে? বিনোদন তো তাদের অধিকার। সম্ভবত এদেশের নারীদের সিংহভাগেরই বিনোদন হিসেবে প্রথম পছন্দ টিভি সিরিয়াল।

কলকাতার সিরিয়াল বন্ধ করে দেওয়া কোন কঠিন ব্যপার নয়। শুধু নির্দিষ্ট চ্যানেলগুলোর আমদানি বন্ধ করে দিলেই হোল। পরিবর্তে কি দেওয়া হবে? এদেশে তৈরি করা নাটক? আমাদের নাটকগুলো সাধারন দুই ধরণের – হয় আমি আর তুমি কেন্দ্রিক পেঁনপেঁনে প্রেম নাহয় রগরগে ভাঁড়ামি। এগুলোও কি মানসম্পন্ন? ভালো নাটক যে হচ্ছে না তা নয় কিন্তু সংখ্যায় কম।

বোম্বাই সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত কলকাতার সিরিয়ালগুলোকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কথা বলে বন্ধ করা যতটা জরুরী তার থেকেও বেশি জরুরী ভালো মানের নাটক এদেশে তৈরি করা।

%d bloggers like this: