Category Archives: অনুভূতি

তুই ও তোর জন্যে…

তুই কেমন আছিস সেটা মাঝে মাঝেই বুঝতে পারি না। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখা তো তোর বহু দিনের পুরনো অভ্যাস। তবুও জানতে ইচ্ছে করে, তোকে খুব ভালবাসি তো তাই। কবে থেকে যেন তোকে তুই বলছি? মনে নেই। কি করে যে হল এই ‘তুই’ ব্যপারটা বুঝতেই পারিনি। মনে হয় তোকে কত দীর্ঘ সময় ধরে চিনি। অথচ কতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম তোকে ছাড়া, তোদের ছাড়া। দেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু দেখাটা যে এত গভীর হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। আর এখন? তোকে ছাড়া, তোদের ছাড়া হয়তো আর বাঁচতেই পারব না।

একটু পরেই তোর জন্মদিনের সময়টা শুরু হবে। কত হল রে? যতই হোক। তুই আমার কাছে সবসময় পিচ্চিই থাকবি। বাচ্চাদের কাছে যেমন বারবি ডল তুইও আমার কাছে তাই। তোর অভিমান, হাসি আর খুনসুটি দেখার জন্য আমি আরও অনেকদিন বাঁচতে চাই।

সব দীর্ঘশ্বাসগুলো আমায় দিয়ে তুই সবসময় ভালো থাকিস, হাসিখুশি থাকিস। তোর হাসি মাখা মুখ দেখলেই মনে হয় আমি ভালো আছি, বেঁচে আছি।

অনেক অনেক আদর, শুভ জন্মদিন।

হাওয়াই আদর

একটা মিটিং ছিল ব্রহ্মপুত্রের তীরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কে। একটা নতুন প্লাটফর্ম তৈরি নিয়ে মিটিং, যেখানে সবাই যুক্ত থাকতে পারবে, যেখানে খবর পাওয়া যাবে দেশ বিদেশের কিন্তু খবরের চাপ নিতে হবে না।

যাইহোক ভালোয় ভালোয় শেষ হল সব। যার যার মত চলে গেল সবাই, আমি রয়ে গেলাম নদীর ধারে একটু হাঁটব বলে। যদিও বার বার নদী বলছি কিন্তু আসলে এটা নদ। আমার অবশ্য নদ শব্দটা একেবারেই পছন্দ না। নদীর মিষ্টি পানি, কুল কুল করে বয়ে চলা স্রোত, স্রোতের সেই শব্দ, নদীর ধারের কোমল বাতাসের পরশ এই সব ব্যপারগুলতেই একটা নারী সুলভ কোমলতা আমি অনুভব করি। কাটখোট্টা পুরুষালী কোন ব্যপারের সাথে আমি এসবের কোন মিল খুঁজে পাই না। তাই ব্রহ্মপুত্র আমার কাছে ব্রহ্মপুত্রী, নদ নয় নদী।

এই নদীটা আমার কত কথা যানে। কত পুরনো, কত আপন। তাই একটুক্ষণ সময় কটাতে চাইলাম দুজনে।

পাড় ঘেঁষে একটু দাড়াতেই অনুভব করলাম সেই পুরনো আদুরে হাওয়ার স্পর্শ। খুব কাছের কেউ পেছন থেকে আলতো করে ঘাড়ের কাছে মুখটি এনে জড়িয়ে ধরলে হয়ত এমন একটা আদুরে অনুভূতি হতে পারে।

হঠাৎ হাওয়াই মিঠাইয়ের মতন মিলিয়ে গেল নদীর হাওয়াই আদর! ভাবলাম এবার হয়ত প্রতিদান দেওয়ার পালা। একটু পরেই আবার হাওয়া বইতে শুরু করল। আমারও ফেরার সময় হয়ে গেল। ফেরার পথে পা বাড়ালাম।

ফিরতি পথে নদীর হাওয়াই আদর পেছন থেকে আলতো করে ঘাড়ের কাছে মুখটি এনে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলে দিল – ‘আদরের কোন প্রতিদান হয়না বোকা’।

অনেক দিন বাঁচো

চোখের দিকে একটু তাকালেই নিষ্পাপ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, সবসময় পাশে পাশে থাকতে ইচ্ছে করে আরেকটু পবিত্র হওয়ার আশায়। স্পর্শে যে এতো আদর লুকিয়ে থাকে সেটা কে জানতো।

তোমার সাথে রাতের আকাশ দেখেছিলাম। কি বিশাল, অসংখ্য তারায় শোভিত। অথচ কত ম্লান তোমার সামনে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম চুপচাপ, হঠাৎ হাত ধরে মনে করিয়ে দিলে ভালোবাসায় আমারও অধিকার আছে।

সময় বড়ই নির্মম হয়েছিল আমাদের সাথে। কত বছর কেটে গেলো, তাই না? কতটা পুড়েছে তোমার-আমার তার হিসেব বোধয় সময়ের কাছেও নেই।

আগে আমার খুব মৃত্যুভয় হতো। এখনো হয় একটু একটু। তাই মৃত্যু আমার চিন্তার একটা দিক দখল করে আছে। হঠাৎ হঠাৎ একটা ভাবনা চলে আসে মাথায় – তুমি যদি আমার আগে মরে যাও? ভাবনাটা বুকের বামপাশে একটা ব্যথার জন্ম দেয়। বুকের ভেতর থেকে একটা নোনা উচাটন যেন জমাট বাঁধতে থাকে গলার কাছটায়। আমি কাঁদতে পারিনা। ব্যথাটা বুকেই চাপা দিয়ে রাখি।

তুমি আরও অনেক দিন বাঁচো। ইচ্ছে মত। ক্ষতগুলো মুছে দেওয়া যাবে না যানি কিন্তু ভুলা তো যায়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি নাহয় সে চেষ্টাটাই করবো।

অনেক দিন বাঁচো মা…

গ্রামের নামটি গর্জনা

গর্জনা, বাবার মুখে শোনা একটি শব্দ ছিল মাত্র। সাথে আবছা ভাবে জড়িয়ে ছিল একটা সবুজ গ্রাম, একটা নদী, কিছু মানুষের মুখ, দাদার মুমূর্ষু অবয়ব।

কতদিন কেটে গেছে আমি যেতে পারিনি অথচ নীল জল সীমান্ত ছুঁয়ে এসেছি পরপর দুবার। ওখানে আমার আঁতুড়ঘর নয়, যেখানে জন্মেছিলাম সেটা একটা ক্লিনিক; এখন অস্তিত্বহীন। যদি ওখানে জন্মাতাম তবে হয়তো কেউ যত্ন করে রাখত আমার আঁতুড়ঘর। বাবার জন্মটাও ওখানে নয় তবুও সৃষ্টির আদি রহস্যটা যেন ওখানেই!

টোক, ঝিনাই ও বামনজানি নদীর গর্জন মুখর মোহনায় অবস্থিত বলে এর নাম গর্জনা। ঘাটাইল উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত শেষ গ্রাম। তিনটি ইউনিয়নেরও সীমান্ত গ্রাম গর্জনা। আমার গ্রাম।

এক নরবিচ্ছিন্ন টানে শেষপর্যন্ত পৌঁছে গেলাম সেদিন সন্ধ্যায়। কাছের মানুষ, কাছাকাছি দাড়িয়ে থাকা বাড়ি, সবুজের মাঝে হলুদ সর্ষে ফুলের হাঁসি, ঝিনাই নদী আর নির্মল বাতাস এই নিয়ে কেটে গেল জীবনের ভালো থাকার কয়েকটা দিন, সাগরের জলের ঝাঁপটার মতন। সত্যিই জীবনে আমরা অল্পই ভালো থাকি।

ভুলতে পারিনা ঝিনাই নদীর উপরের ছোট্ট ব্রিজটার কথা। ওটার উপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। সন্ধ্যায়। আকাশজুড়ে ছিল তারা আর পনের-বিশ দিনের একটা চাঁদ। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ওপারের শঙ্করপুর, শঙ্করপুরের দোকানপাট, ডানপাশের নদী, নদীর পাড়ের গ্রাম আর রাত্রিকালীন গ্রামীণ জীবনের নীরবতা। বাঁপাশটা যেন সাধারণের থেকে একটু বেশিই আলাদা হয়ে যেতে চাইছিল, দুপাশের সারি সারি গাছ যেন আকাশের চোখ থেকে ঢেকে রাখতে চাইছে নদীটাকে।

আঁধার যেন সুন্দরের সৌন্দর্য ম্লান করে দিতে না পারে সেজন্য আকাশে চাঁদ ওঠে, তারারা মিটিমিটি জ্বলে। সুন্দর তখন হয়ে ওঠে আরও রহস্যময়, দুর্বার আকর্ষণীয়। প্রথম বারের মতো আমি এটা উপলব্ধি করলাম।শহুরে জীবনে আমি এখনো অনুভব করি সেই দূর্বার আকর্ষণ।

গর্জনা, এখন আমার কাছে ঝিনাই নদী, পাশে জীবন্ত একটি গ্রাম, প্রিয় কিছু মানুষের মুখ, সবুজের বুকে হলুদ সর্ষের হাঁসি; আমার গ্রাম।

আহা জীবন

আহা জীবন! কত স্বাদ বেঁচে থাকার। আমিও আছি একরকম।
আচ্ছা ও কি জানে আমি কখন কিভাবে বেঁচে থাকি? কতবার কিভাবে মরেছি? জানে না বোধয়। ও শুধু জানে আদর, যত্ন আর ভালবাসা। প্রেম, ব্যাপারটা কি ও ঠিকঠাক বোঝে? আমিই কি বুঝি?
গতপরশু খুব মন খারাপ ছিল আমার, ও বারবার জানতে চাইল কেন মন খারাপ? আমি বোঝাতেই পারলাম না যে কারণ আমার জানা নেই। শেষমেশ ওরও মন খারাপ হয়ে গেল। বুঝতেই পারল না আমার কেন যে মন খারাপ তা যদি আমি জানতাম তাহলে ওকে বলতাম। ওর চেয়ে ভালো আর কে বাসে আমাকে?
ওর বুকের মধ্যে মুখ গুজে দিলে একটা সুন্দর গন্ধ পাই। একটা স্বর্গীয় সুখ। আহা এই তো জীবন। এভাবেই বাঁচতে চাই।
প্রথম যেদিন ওর ঠোঁট আমার ঠোঁটকে ছুঁয়ে গেল মনে হোল যেন নিজেই নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম। ওটা যেন আমারি ঠোঁট। ও যদি আমার হয় তাহলে ওর ঠোঁট কেন আমার হবে না। সেই উষ্ণ কোমল ঠোঁট আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মনে রাখব।
সিগারেট খেয়ে ওর সামনে গেলে চোখের দিকে তাকাতে পারি না আমি। মায়াবী চোখ দুটি অবুঝ প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আমার দিকে – কেন? কি যে অস্বস্তিতে পরে যাই আমি।
ওকে জড়িয়ে ধরে একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মত কাল্পনিক ভাবনা আমি ভাবি না, পাশাপাশি দাড়িয়ে লড়ে যেতে চাই একসাথে। বাঁচতে চাই একটা জীবন।
বিধি বাম। আদমের মত আমার কপালেও স্বর্গসুখ সইলো না। আজ ও চলে যাচ্ছে, আবার দেখা হবে কিনা জানি না।

%d bloggers like this: