দিন শেষে একা

লাল রংটা কল্যাণের বেজায় অপছন্দ। কিন্তু আজ এই রঙটাই ওকে দেখতে হবে অনেকক্ষণ। তারপর…

হাতের ঘড়িটা একবার দেখেনিল কল্যাণ। তিনটা বেজে ছাব্বিশ। অনেক রাত। কিন্তু মোড়ের সিগারেটের দোকানটা এখনো খোলা। সারারাতই খোলা থাকে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে একটা সিগারেট খেতে কিন্তু উপায় নেই, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এঘড়ে কোন ছাতা নেই। এত রাতে মায়ের রুমে গিয়ে ছাতা নিয়ে আসার প্রশ্নই আসে না। অগত্তা সিগারেটের চিন্তাটা বাদ দিতে হল।
চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে ও। ভাবছে – এখনই শুরু করবে কি না। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিড়ে। কত রঙিন মনে হত একসময় জীবনটাকে। মনে হত যত সমস্যা সব বড় হলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না বড় হওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে সমস্যাগুলোও আরও বড় হয়েছে। ও কাওকে বুঝতে দেয়না, দীর্ঘশ্বাসগুলো চাপা দিয়ে দেয় বুকের মধ্যে। মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায় কিন্তু কাওকে বলে না।
একটা সময় খুব একাকীত্বে ভুগতো ও। খুব একা একা লাগত; খুব। তারপর নিজেই একসময় আবিষ্কার করল – একাকীত্ব আসলে দুর্বলতা নয় শক্তি, a source of energy. কারন? কারনটা খুব সহজ। একা মানুষের হারানোর ভয় থাকে না। এমন নয় যে ওর পৃথিবীতে কেউ নেই। আছে সবাই আছে – বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয় সবাই। কিন্তু এত মানুষের মাঝেও ও একা, বড় একা। মা ভাত বেড়ে খাওয়ায়, বাবা ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে, বোনের আদুরে শাসন, ভাইয়ের বায়না সবই ভালো লাগে তবুও কোথাও যেন একটা শূন্যতা, একটা ফাঁকা রয়ে গেছে যার ফলে জীবনটাকে বড় অর্থহীন লাগে। একবার ভেবেছিল বিয়ে করে ফেলবে অথবা একটা প্রেম। কিন্তু পরে ভেবে দেখল এতে ঝামেলা আরও বাড়বে। এতে পরিবারের সদস্য সংখ্যা একজন বাড়া ছাড়া আর তেমন কোন লাভ হবে না। বরং একাকীত্বের এই যে উপভোগটুকু, এটাও আর থাকবে না। একাকীত্বই হয়তো ওর নিয়তি।
যাইহোক ওসব চিন্তা বাদ। এখন শুধুই মুক্তির চিন্তা। মুক্তি কেন? কারন এই একাকীত্বও আর ও উপভোগ করতে পারবে না খুব বেশি দিন, এটাও ওর কাছে খুব বোরিং লাগতে শুরু করেছে। ও বুঝে গেছে – একাকীত্বের দীর্ঘ উপভোগ বলে কিছু হয় না।

শুয়ে থেকেই একবার বালিশ থেকে মাথাটা তুলে দেখে নিল টেবিলের উপর ব্লেড টা আছে কি না। আছে।

সকাল সাড়ে আট টা
‘কল্যাণ, এই কল্যাণ ওঠ অফিস যাবি না?’ মা দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন আর ডাকছেন।
আর একটু পর
কল্যাণের দরজায় বাড়ির সবাই এসে জড়ো হয়েছে। উদ্বিগ্ন প্রতিটা মুখ। মা কাঁদছেন। দরজার নিচে দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে, লাল রক্ত, লাল…

তুই ও তোর জন্যে…

তুই কেমন আছিস সেটা মাঝে মাঝেই বুঝতে পারি না। দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখা তো তোর বহু দিনের পুরনো অভ্যাস। তবুও জানতে ইচ্ছে করে, তোকে খুব ভালবাসি তো তাই। কবে থেকে যেন তোকে তুই বলছি? মনে নেই। কি করে যে হল এই ‘তুই’ ব্যপারটা বুঝতেই পারিনি। মনে হয় তোকে কত দীর্ঘ সময় ধরে চিনি। অথচ কতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম তোকে ছাড়া, তোদের ছাড়া। দেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু দেখাটা যে এত গভীর হয়ে যাবে ভাবতেই পারিনি। আর এখন? তোকে ছাড়া, তোদের ছাড়া হয়তো আর বাঁচতেই পারব না।

একটু পরেই তোর জন্মদিনের সময়টা শুরু হবে। কত হল রে? যতই হোক। তুই আমার কাছে সবসময় পিচ্চিই থাকবি। বাচ্চাদের কাছে যেমন বারবি ডল তুইও আমার কাছে তাই। তোর অভিমান, হাসি আর খুনসুটি দেখার জন্য আমি আরও অনেকদিন বাঁচতে চাই।

সব দীর্ঘশ্বাসগুলো আমায় দিয়ে তুই সবসময় ভালো থাকিস, হাসিখুশি থাকিস। তোর হাসি মাখা মুখ দেখলেই মনে হয় আমি ভালো আছি, বেঁচে আছি।

অনেক অনেক আদর, শুভ জন্মদিন।

অসুখ

একগাদা ওষুধ লিখেছে ডাক্তার। সেগুলো নিতেই আজ এদিকটাতে আসা। নয়তো এদিকের এই ভিড়ের মধ্যে কে আসতে চায়। শহরের এদিকটায় আসার একটা ভালো দিকও আছে – এখানে প্রায় সব ওষুধ পাওয়া যায় তাও আবার পাইকারি দামে।
ছোট দোকানটায় যায়গা বড়ই কম তবুও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পনের মিনিট হতে চলল দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। সিরিয়াল পাবার নাম গন্ধও নেই।

অবশেষে কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রেসক্রিপশনটা দোকানদারের হাতে দিলাম, ব্যস। এবার শুধু অপেক্ষার পালা। আমার বাঁদিকটায় দেয়াল, দোকানের শেষপ্রান্ত আর ডানপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। তার ওষুধ নেওয়া বোধয় শেষ তবুও একবার মিলিয়ে দেখছে ঠিকঠাক আছে কি না। আমি সারি সারি করে সাজানো ওষুধের বাক্স দেখে দেখে নাম পড়ছি আর ভাবছি – সকল রোগের ওষুধ কি সত্যই পাওয়া যায়।
হঠাৎ সিনিয়র একজন দোকানদার জুনিয়র একজনকে প্রশ্ন করল -‘ওই চাচা কি ট্যাকা দিছিল’? আমি ডানে তাকিয়ে দেখলাম বুড়ো নেই।
‘না তো ভাই’। জুনিয়র উত্তর দিল।
‘ট্যাকা না দিয়া গেল কই? জলদী যা, খুইজ্জা লইয়ায়।’

কিছুক্ষণ পর ছেলেটা সেই বৃদ্ধ লোকটিকে হাতে ধরে নিয়ে এলো। স্বাভাবিক ভাবেও নয় আবার ঠিক টানতে টানতেও নয়। তবে দেখে বুঝা যাচ্ছে বুড়ো অনুসুচনায় ভুগছে।
‘চাচা আপনে ট্যাকা দিছিলেন ওষুধের?’ সিনিয়রের সরাসরি প্রশ্ন।
‘মানে…ইয়ে…’ বুড়ো আমতা আমতা করতে লাগল। ‘আসলে ভুল করে নিয়ে চলে গেছিলাম। এই নিন…’ বলে ওষুধগুলো কাউন্টারে রাখলেন। হঠাৎ বুড়োর চোখ জোড়া যেন ছলছল করে উঠলো।
‘ওষুধ চাই নাই তো, ট্যাকা দেন ওষুধ নেন।’
বুড়ো চুপ।
‘চাচা সমস্যাডা কি কনতো।’
আমরা আশেপাশের সবাই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছি বুড়োর দিকে। বুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, বলল – ‘আমার নাতিটা তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি, আমার কাছে ওষুধ কেনার টাকা নাই’।

পোতালা প্যালেস

potala-palace-1920

১৯০৪ সাল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক একটা ছবি ছাপল তাদের পত্রিকায়। বিশ্ববাসী তাক লেগে গেল সেই ছবি দেখে, শুরু হয়ে গেল হৈচৈ। এই ছবি এই আগে কেউ দেখিনি এমনকি ছবির বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনাও হয়নি কথাও। কি সেই ছবি?

ছবিটি ছিল পোতালা প্যালেস এর। এটি তিব্বতের একটি বহু পুরনো প্রাসাদ। ৫ম দালাই লামা এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন আনুমানিক ১৬১৭ থেকে ১৬৮২ সালের মধ্যে কোন এক সময়। ১৪শ লাদাই লামার ভারতে আসার আগে পর্যন্ত এটি ছিল দালাই লামাদের বসবাসের স্থান। এখান থেকেই সকল দালাই লামাগন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

ইওনেস্ক ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই প্রাসাদটির রয়েছে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গঠন শৈলী যা এখানকার আধ্যাত্মিকতার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এটি অবশ্য জাদুধর।

ছুটিবিহীন জীবন

এক ভদ্রলোক তার স্ট্যাটাসে লিখেছে, অনেকদিন ছুটি নেয় না, প্রায় দু’বছর। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় না, আত্মীয়দের বাসায় যায় না। শুধু অফিস টু বাসা, বাসা টু অফিস। আর এটা নাকি তার স্ত্রীর উৎসাহেই হয়েছে। লেখাটা পরে মনে হল না তিনি এই ব্যপারটায় অখুশি। তবে এখানে আমার একটা দ্বিমত আছে।

তোরাহ’তে আছে মসী (মুসা আঃ) যখন দেখলেন যে হিব্রু দাশ জাতির জীবনে ছুটি বলতে কিছু নেই তখন তিনি শনিবার কে হিব্রুদের ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেন। দিনটিকে হিব্রুতে সাব্বাত বলা হয়। সহজ করে বলা যায় ‘মসীর দিন’। এটিকেই বলা চলে অফিসিয়ালি ছুটির প্রথম ঘোষণা। যাইহোক, মসী বুঝতে পেরেছিলেন যে সপ্তাহে এক দিন ছুটি না পেলে জীবনের সাভাবিক ছন্দ বা গতি কোনটাই থাকে না।

একই কারনে আমিও ছুটি না নেওয়াটাকে অপছন্দ করি। অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠান মালিকের কাছে ছুটি না নেওয়াটা একটা আইকনিক ব্যপার রীতিমত। সম্ভবত এক-দু’বছর আগে এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক পুরষ্কার পান এই কারনে যে তিনি তার সার্ভিস লাইফে একদিনও ছুটি নেননি। আমার হিসেবে লোকটিকে পুরষ্কার না দিয়ে তিরস্কার করা উচিৎ ছিল। কারন তিনি রীতিমত অসামাজিক একজন লোক। ‘ছুটি নেননি’ এই ব্যপারটা থেকে এটা পরিষ্কার যে তিনি নানান ধরণের দাওয়াত এমনকি শেষকৃত্তের অনুষ্ঠানেও ঠিকমত যোগ দেননি। কারন কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলে, পুরো অনুষ্ঠানে ঠিকমত অংশ নিয়ে শেষ করলে এক দিন তো নিশ্চিত ভাবেই লাগবে। কিন্তু তিনি তা নেননি। তাই তাকে সহজ ভাষায় অসামাজিক বলাই যায়।

সেই শিক্ষক লোকটির উদাহরণ দিয়েছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক। উনার এহেন অসামাজিকতা ভালো লাগার কারন আছে বৈকি!

%d bloggers like this: